রবিবার
রাত ৯ঃ৩৫
২২ মার্চ ২০২০
আমি সব সময়ই এভারেজ ছিলাম। পড়াশুনা, খেলাধুলা, অন্য যে কোনো কাজে। ক্রিকেট একটু ভালো খেলতাম তবে ফুটবল একেবারেই ভালো নয়। ভাগ্যক্রমে আমি এমন পরিবেশে বড় হয়েছি যেখানে ছেলে থেকে বুড়ো সবাই মারাত্মক খেলা পাগল।
পুরো মাঠ ঘুরে শেষমেশ জায়গা হয় লেফট ব্যাকে। কাউকে আটকে পারতাম না। সবাই পায়ের নিচ থেকে বল নিয়ে চলে যেত। এ নিয়ে চরম হতাশায় ভুগতাম। আমাদের মাঝে মাঝে খেলা শেখাতো সেতু ভাই, উনি প্রফেশনাল ফুটবলার। আমার পিছনে অনেক সময় নষ্ট করে বুঝলেন আমাকে দিয়ে হবে না। পাড়ার মাঠেও এতো বাজে খেলি যা বলার মতো না। হুট করে একদিন খেলা শেষে সেতু ভাই আমাকে ডেকে বললেন, “তোমার সমস্যা কি জানো? তুমি হীনমন্যতায় ভুগো। খেলা শুরুর আগে তুমি খেলা হেরে যাও। তুমি কখনো ভাবো না যে তুমি কোনো একটা শট ভালো খেলবা, কাউকে ভালোভাবে ট্যাকেল করতে পারবা। খেলা তোমার মাথায় মাঠে না।”
আমি ঐদিন বুঝি নাই কিছু উনি কি বললেন। আমি শারীরিকভাবে হ্যাংলা কিন্তু একবার মাঠের সুঠামদেহী মিড ফিল্ডারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিই। আসলে ওর সাথে রেষারেষির জন্য দিয়েছিলাম। আমি কখনো কল্পনাও করি নাই তাকে ফেলে দিবো। কি যেন এক ঐশ্বরিক শক্তি আমাকে ভর করেছিলো। খেলা শেষে এ নিয়ে অনেক ভেবেছিলাম। পরে বুঝলাম আচ্ছা খেলা আমার মাথায়, আমার ব্রেইনে, আমার চিন্তা-চেতনায়। আমি আসলে ভয় করতাম, যদি আমি পড়ে যাই। যদি পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে যায়। আমার মনে এমন কল্পনা আসত যে আমি এই শট নিতে পারব না, বলটা পাস করতে পারব না। প্রতিপক্ষের চোখে ধোকা দিয়ে বল বের করতে পারব না। আমি আগেই এগুলো মেনে নিতাম।
কিন্তু এ ঘটনার পর আমাকে পায় কে। মাঠের সব বাঘা বাঘা স্ট্রাইকারদের চোখে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাদের ট্যাকেল করেছি। আমি ফাউল খেলতাম না তবে সব মারমুখি খেলোয়াড়েরা আমার সামনে আসতে ভয় পেত। আমি রং খেলতাম না, আমি আগে থেকেই খেলার নিয়মকানুন জানতাম। আমি সবার মাঝে সেরা হয়ে উঠি নাই, কিন্তু আমার কাছে নিজের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যায়।
আরেকটি ঘটনা বলি, আমি তখন ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমীতে নতুন প্রাক্টিস শুরু করেছি। রমজান মাস তাই গেম ডে বেশি চলত। আমি ব্যাটসম্যান ছিলাম কিন্তু একে তো নতুন আর শুরু একটি টেস্ট ম্যাচে প্রথম ওভারে দুই রানে আউট হওয়ায় বোলারদের সাথে নামতে হত।
যা ক্রিকেট নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো সব তলানিতে এসে ঠেকে। তবে একটা সুযোগ খুজছিলাম নিজেকে প্রমাণ করার। কিন্তু আমার ব্যাটিং আসার আগেই টিম ম্যাচ জিতে যেত। ৪ ওভারেই ছয় জন আউট হয়ে যাওয়ায় এক ম্যাচে ৮ম প্লেয়ার হিসেবে নামি। বলা বাহুল্য সেদিনো আমার আত্মবিশ্বাস ছিলো আকাশ ছুঁই ছুঁই। ম্যাচ সেদিন হেরেছিলাম কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত খেলে এসেছিলাম। কোচ, আমার ম্যাট, প্রতিপক্ষ সবাই এসে ঘাড় ছাপড়ে বলেছিলো কই ছিলা এতোদিন। সেদিনের পর থেকে ক্লেমনের খেলার শেষ দিন পর্যন্ত অপেনিং করেছি। আমি প্রতি ম্যাচ ভালো খেলতাম না তবে নিজের প্রত যেদিন বিশ্বাস রেখে ব্যাট হাতে মাঠে নেমেছি সেদিন দলের জন্য ভালো পারফর্মেন্স করে এসেছি।
আমি ছোটবেলা থেকেই অলস প্রকৃতির। সকালে ঘুম থেকে উঠা আমার জন্য যেন মহা ভারী কাজ। একবার মাথায় ম্যারাথনে দৌড়ানোর ভুত চেপে বসল। ম্যারাথন আসতে এখনো ১০ মাসের বেশি দেরি। তবুও আমি প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। আমার বাসা থেকে ধানমন্ডি লেকের দুরত্ব ছিলো ১ কিলোমিটারের কিছু বেশি। পুরো লেক দেড় কিলোমিটার, আপডাউন মিলিয়ে আমি প্রথম কিছুদিন সাড়ে তিন থেকে চার কিলোর বেশি দৌড়ায় নি।
আমি আমার চারপাশে দেখলাম পঞ্চাশ - ষাটোর্ধ বুড়োরা যদি আমার থেকে বেশি দৌড়ায় তবে আমি জোয়ান হয়ে কেনো পারব না। আমি একদিন টানা ১২ কিলোমিটার দৌড়িয়েছিলাম ক্লান্তি বোধ হয় নি। কারণ আমি সেদিন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। আবার শরীর চাঙ্গা থাকার পরেও আমি আমি ৫ কিলোমিটারের বেশি দৌড়াতে পারি নাই। কারণ সেদিন গুলোয় দৌড়াতে মন চাইত না।
সানজু'র দ্য আর্ট অব ওয়ার বইটি পড়ছিলাম। সানজু'র দাবী আপনি যুদ্ধে যাবার আগে অর্ধেক যুদ্ধ জিতে যেতে পারেন। আর সৈন্যদের আত্মবিশ্বাস যদি তুঙ্গে থাকে তবে সেই সৈন্যদলকে হারানো অসম্ভব বলা যায়। আর হতাশায় ভুগা যত বড়ই সেনাবাহিনী হোক না কেনো তাদের হারানো মুহুর্তের বেপার।
আর পাওলো কোহলের ‘দ্য এলকেমিস্ট’ বইয়ে পড়েছিলাম, “ভয় হচ্ছে জীবনের অন্যতম বাধা। অন্য যেকোন দর্শনীয় বাধার চেয়েও ভয়ংকর বাধা হচ্ছে ভয়।”
এতোটুকুই বলব, নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন দুনিয়া আপনার নখদর্পণে এসে যাবে। ভয় কিংবা ল্যাক অব কনফিডেন্স যাই বলুন না কেনো। এর শুরুটা হয় আপনার ব্রেইনেই। একে যদি শুরুতে দমন করা যায় জয় তবে নিশ্চিত। আমার এই ঘটনা গুলো শিক্ষণীয় কিনা জানি না তবে আমি নিজের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি।
Comments
Post a Comment